Wednesday, 30 November 2022

স্বাধীনতার ৫০ বছরে নারীর নিরাপত্তা কি নিশ্চিত হয়েছে?

Editor: Md Shovon Khan
Wednesday, 29 December 2021 1396

মনিরা নাজমী জাহান : নারীর প্রতি সহিংসতা যেন আমাদের জীবনে এক নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন একটি দিন পাওয়া অসম্ভব যে দিন খবরের কাগজে চোখ রাখলে দেখা যাবে না যে দেশের কোথাও না কোথাও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নারী নির্যাতনের যেন মহা উৎসব চলছে সারা দেশজুড়ে। কিন্তু এই ভয়াবহ সহিংসতা নিয়ে ভাবার সময় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার নেই। এই সমাজ ব্যবস্থা শিখিয়েছে কীভাবে নারীকে ভোগ্য পণ্য হিসেবে ভাবা যায়। কীভাবে নারীর প্রতি সহিংস আচরণ করে নারীকে অবদমিত করা যায়। একজন নারীকে জন্মের পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিনিয়ত ভাবতে হয় তার নিরাপত্তার কথা। তাকে প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাতে হয়।  বাবার কাছ থেকে মেয়েকে কিংবা স্বামীর কাছ থেকে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে ধর্ষণের মতো ঘটনা অহরহ ঘটছে। একের পর এক সংবাদ এসে হাজির হচ্ছে বীভৎস বর্বরতার বর্ণনা নিয়ে। বীভৎস ঘটনা থেকে বাদ যাচ্ছে না প্রতিবন্ধী কিংবা ছয় বছরের শিশুও।

এক এলাকার ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে গণমাধ্যম কেঁপে উঠছে নতুন আরেক ঘটনায়। বছরে বিভিন্ন প্রকার ছুটির কারণে কর্ম জীবন বন্ধ থাকলে নারী নির্যাতনে কোনও ছুটি নেই। বছরে এমন একটি দিন পাওয়া যাবে না যে দিন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে না। এই নির্যাতনের  ক্ষেত্রে থাকছে না কোনও বয়স, স্থান, কাল, পাত্রের ভেদ। শুধু রাত-বিরাতে নয়, দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে। ঘরে-বাইরে, রাস্তাঘাটে, যানবাহনে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সহ এমন একটি জায়গা পাওয়া যাবে না যেখানে  ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে না। অথচ প্রত্যেক নারী-পুরুষের স্বাধীনভাবে চলা ফেরা করা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে। সেই স্বাধীনতাকে থোড়াই কেয়ার করা হচ্ছে!  একুশ শতকে পদার্পণ করে বর্তমান বিশ্বে যে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পালাবদলে শুরু হয়েছে  সেই পালাবদলে নিঃসন্দেহে  নারী সেখানে এক অপরিহার্য অংশীদার। দেশ গড়া থেকে শুরু করে জীবন গড়ার যুদ্ধেও নারী অন্যতম শরিক ও সঙ্গী কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিঃসন্দেহে বলা যায় নারী হয়ে জন্ম নেওয়াটাই যেন নারীর আজন্মের পাপ।

এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি তথ্য মতে দেশে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ধর্ষণ–সংক্রান্ত ১ হাজার ১৮২টি ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ধর্ষণ ৯৫৫টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ২২০টি ও ধর্ষণের চেষ্টা ২৫৯টি। অর্থাৎ দিনে প্রায় চারটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। একই সময়ে রাস্তা, যানবাহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, এমনকি বাড়িতে দেশের প্রায় ৮৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে এ পরিসংখ্যান দিয়েছে তারা।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০২০ সালে বাংলাদেশে ১৬২৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে ৫৩ জন এবং ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ১৪ জন। ২০২০ সালে  বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন ৫৫৪ জন নারী যাদের মধ্যে ২৪০ জনকে  তাদের স্বামী হত্যা করে। অথচ এই ২০২০ সালে করোনা নামক ভয়াবহ ভাইরাস যা স্তব্ধ করেছিল গোটা পৃথিবীকে। এই ভাইরাসের কবলে পড়ে পৃথিবীতে এমন কোনও সেক্টর নেই যেই সেক্টরের চাকা থমকে যায়নি। কিন্তু এই ভয়াবহ করোনাভাইরাসও পারেনি নারী নির্যাতনকে থামাতে। করোনা নামক মহামারি বাতাসের সাথে ছড়িয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে মানবসভ্যতার আলো, মানুষ যখন প্রতিটি মুহূর্তে মৃত্যুর প্রহর গুনছে তখন থেমে থাকেনি নারী নির্যাতন। নারী শুধু ঘরের বাইরে নয় নিজ ঘরেও নিরাপদ ছিল না এই করোনাকালে। ২৪০ জন নারীকে তাদের স্বামীর হাতে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

গা শিউড়ে ওঠার মতো পরিসংখ্যান! ভাবতে অবাক লাগে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করছি। অথচ দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী– সেই নারীর স্বাধীনতা আমরা কতটুকু নিশ্চিত করতে পেরেছি সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে? যখন আমরা বলছি আমরা নিজস্ব স্যাটেলাইটের  যুগে প্রবেশ করেছি, সেই সময় আমরা জীবন-যাপন ডিজিটাল করার সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি সহিংসতাকেও দিয়েছি ডিজিটাল রুপ। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ও  প্রতিনিয়ত নারীকে সহিংস পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কখনও আইডি হ্যাক করে, ব্যক্তিগত মুহূর্ত ভিডিও  বানিয়ে ব্ল্যাকমেইলিং করে, মোবাইল হ্যারাজমেন্ট করে, অশ্লীল কন্টেন্ট পাঠিয়ে, ট্রলিং, বুলিং, শেমিং করে নারীকে বিভিন্ন উপায়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০২০ সালের গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে সাইবার অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৫৬ দশমিক ৫৫ ভাগ নারী।

এই কথা অস্বীকারের করার উপায় নেই যে নারীর প্রতি যে কোনও ধরনের সহিংসতার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে  ভয় দেখিয়ে নারীকে অবদমিত করা হয়। নারীর কোনও অর্জন এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা মেনে নিতে পারে না। নারীর যে কোনও অর্জনে হিংসার আগুনে জ্বলে ওঠে এই সমাজ। এই অর্জনকে বাধাগ্রস্ত করতে হেন কোনও জঘন্য কাজ নেই  যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা করে না। শুধু নির্যাতন নয় এই নির্যাতনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য যুক্তির অভাব হয় না এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়। প্রতিহিংসাকে বৈধতা দিতে এবং এই প্রতিহিংসাকে উসকে দিতে এই ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থা এমন কোনও কু-কর্ম নেই যে করে না। বিভিন্ন অজুহাত তথা পর্দা না করার কারণে, একা চলাচলের কারণে, রাতে চলাচল প্রভৃতি বলে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারীর প্রতি ঘটে যাওয়া সহিংসতাকে এক ধরনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা জানে যে একজন নির্যাতনের শিকার নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেই নারীকে মানসিকভাবে দুর্বল করা সম্ভব। মানসিকভাবে দুর্বল করা গেলে একজন নারীর ন্যায় বিচারের জন্য লড়াই করার শক্তি অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়বে। সব জেনে বুঝে তাই এই বীভৎস সমাজ নারীকে দুর্বল করার জন্য তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলার কুৎসিত খেলায় মেতে ওঠে। একটি সমাজ ব্যবস্থা কতটা নোংরা হলে একজন নির্যাতনের শিকার নারীর পক্ষে না দাঁড়িয়ে বরং তার ন্যায় বিচার পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে?

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে যে দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় মাহফিলে নারীর প্রতি বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়, সামাজিক গণমাধ্যমে নারীকে নিয়ে ট্রল করা হয়, বডি শেমিং করা হয় এমনকি মূলধারার গণমাধ্যমেও বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে নারীকে আপত্তিকর ভাবে উপস্থাপন করা হয় সে দেশে আসলে নারীর প্রতি প্রতিহিংসা নিয়ন্ত্রণ কতটুকু সম্ভব? যে সমাজে নারীর নিরাপত্তা বিষয়টি বেমালুম ভুলে যাওয়া হয়, যে সমাজ ব্যবস্থায় নারীর প্রতি প্রতিহিংসা উসকে দিতে পারে সেই সমস্ত কাজ নির্বিচারে চলে সেই সমাজে আইন করে, শাস্তি বাড়িয়ে নারীর প্রতি প্রতিহিংসা আদৌ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব? যে সমাজে ধর্ষক নয় বরং ধর্ষণের শিকার নারীটিকে খারাপ চোখে দেখা হয় সেই সমাজ কি  আসলে সভ্য সমাজ?

শুধু উন্নয়নের মহাসড়কের নামে কাঠামোগত উন্নয়ন করলেই চলবে না। কাঠামোগত উন্নয়নের সাথে সাথে চাই মানসিক অবস্থার উন্নয়ন, সমাজ ব্যবস্থার উন্নয়ন। আমাদের দেশের প্রায় অর্ধেক  জনসংখ্যা নারী। অথচ কতটা দুর্ভাগা জাতি আমরা যে স্বাধীনতার ৫০ বছরেও সেই নারীর স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করতে পারেনি। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র কেউ এই ব্যর্থতার দায় এড়াতে পারে না। আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে যে  নারীকে অন্তঃপুরে বন্দী রেখে নারীকে অবদমিত করে কখনোই কাঠামোগত  উন্নয়নের সুফল ভোগ করা সম্ভব নয়।

লেখক: শিক্ষক, আইন বিভাগ, ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়